কোন বাংলাদেশ রেখে যেতে চান সন্তানের জন্য?

খেলাফত মজলিশের নেতা মামুনুল হক গত ১৩ নভেম্বর ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য তৈরির তীব্র সমালোচনা করেন। পুরস্কার হিসেবে দু’দিন পর ১৫ নভেম্বর এক সম্মেলনে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি। সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেছিলেন, ভাস্কর্য নির্মাণ পরিকল্পনা থেকে সরে না দাঁড়ালে তিনি আরেকটি শাপলা চত্বরের ঘটনা ঘটাবেন এবং ওই ভাস্কর্য ছুড়ে ফেলবেন।

তার ওই বক্তব্যের পর আমি সরকারি দল কী প্রতিক্রিয়া দেবে জানতে চেয়েছিলাম সরকারি সংশ্লিষ্ট মহলে। আমাকে জানানো হলো, আমরা এখনও কোনো নির্দেশনা পাইনি। বুঝলাম যে হেফাজতের সঙ্গে সরকারের যে সম্প্রীতির রাজনীতি চলে আসছিল ক’বছর ধরে, সেখানে মামুনুল হক বা ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীমের ভাস্কর্য নিয়ে ‘গর্জন’ আওয়ামী লীগের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করেছে।

এরপর আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখালেও দলটির সাধারণ সম্পাদক বলেছিলেন, তারা বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছেন। কিন্তু পর্যবেক্ষণে সময় ব্যয় না করে মামুনুল হক গংদের বিরুদ্ধে এরপর দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছাত্রলীগ ও যুবলীগ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে শুরু করে।

হেফাজতে ইসলামের আমির জুনায়েদ বাবুনগরী তার পুরোনো চেহারায় ফিরে এসে ২৮ নভেম্বর চট্টগ্রামে এক ওয়াজ মাহফিলে অংশ নিয়ে বলেন, ‘আমি কোনো পার্টির নাম বলছি না, কোনো নেতার নাম বলছি না… কেউ যদি আমার আব্বার ভাস্কর্য স্থাপন করে, সর্বপ্রথম আমি আমার আব্বার ভাস্কর্য ছিড়ে, টেনে-হিঁচড়ে ফেলে দেব’।

সারাদেশেই ইসলামপন্থীদের ভাস্কর্য নিয়ে আস্ফালনের মধ্যে ৪ ডিসেম্বর কুষ্টিয়ায় বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুর করা যেন আগুনে ঘি ঢেলে দেয়া। এটা যে ইসলামের নামে একাত্তরের পরাজিত শক্তিরই শক্তি প্রদর্শনের মহড়া সেটা আর অজানা থাকে না। সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তারাও মাঠে নামেন এবং এর দাঁতভাঙা জবাব দেবেন বলে বার্তা দেন। তারপরও সবাই অপেক্ষা করছিলেন ভাস্কর্য বিতর্কে প্রধানমন্ত্রী কী বলেন জানতে। মৌলবাদী শক্তি আশা করছিল, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাদের জামাই আদরে ডেকে বুঝাবেন। কিন্তু মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে ১৫ ডিসেম্বর রাতে জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণে নাম না নিয়েই প্রধানমন্ত্রী এই মৌলবাদী শক্তিকে বার্তা দিয়েছেন, আস্ফালন তিনি সহ্য করবেন না।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ১৯৭১ এর পরাজিত শক্তির একটি অংশ মিথ্যা, বানোয়াট, মনগড়া বক্তব্য দিয়ে সাধারণ ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের বিভ্রান্ত করতে ইদানীং মাঠে নেমেছে। তিনি বলেছেন, তারা সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে। জাতির জনক ১৯৭২ সালে বলেছিলেন ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার না করতে। কিন্তু পরাজিত শক্তির দোসররা দেশকে আবার ৫০ বছর আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। রাজনৈতিক মদদে সরকারকে ভ্রুকুটি দেখানো পর্যন্ত ধৃষ্টতা দেখাচ্ছে।

 

টেলিভিশন, বেতার, অনলাইনে একযোগে সম্প্রচারিত ভাষণে তিনি বলেন, ‘মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান- সব ধর্ম-বর্ণের মানুষের রক্তের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষ ধর্মপ্রাণ, ধর্মান্ধ নয়। ধর্মকে রাজনীতির হাতিয়ার করবেন না। প্রত্যেকে নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রাখেন। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ।’

ধর্মের নামে এ দেশে কোনো ধরনের বিভেদ-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে দেয়া হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বাংলাদেশ লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ, কাজী নজরুল, জীবনানন্দের বাংলাদেশ। এ বাংলাদেশ শাহজালাল, শাহপরান, শাহ মখদুম, খানজাহান আলীর বাংলাদেশ। এই বাংলাদেশ শেখ মুজিবের বাংলাদেশ; সাড়ে ষোলো কোটি বাঙালির বাংলাদেশ। এ দেশ সবার। ধর্মীয় মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে এ দেশের মানুষ প্রগতি, অগ্রগতি এবং উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাবে।

প্রধানমন্ত্রীর কথাই আসলে এদেশের মানুষের প্রাণের প্রতিধ্বনি। বাংলাদেশ কোন নীতিতে চলবে সেটা ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নির্ধারিত হয়ে গেছে। সেদিন আমরা একটি রাষ্ট্র পেয়েছি কিন্তু রাষ্ট্র তো স্থির নয়, চলমান। সে কতটুকু এগোচ্ছে সেটা আমরা বিচার করবো কীভাবে তাহলে? তার বিচার হবে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর যে প্রত্যাশায় আমরা যাত্রা করেছিলাম তার সঙ্গে বছর বছর হিসাব মিলিয়ে।

সে হিসাবে আমরা আজ ৪৯ বছর পেরিয়ে ৫০ বছরে পা দিয়েছি। গত ৪৯টি বছর কখনও আমরা এগিয়েছি একটুখানি, কখনও বা পিছিয়েছি তার চেয়ে দ্রুতগতিতে। চূড়ান্ত বিচারে এসে দেখছি দক্ষিণ এশিয়ায় আমাদের অগ্রগতি এখন দৃশ্যমান। বিশেষত গত ১২ বছরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশ। যেসব প্রতিবেশী গরিব বলে আমাদের অবজ্ঞা করেছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আসছে। ভারত স্বপ্ন দেখেছিল ১৯৪৭ সালে আমরা পূর্ববঙ্গের তথা বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে গেলেও ২৫ বছরের মধ্যে অর্থকষ্টে পাকিস্তানকে ফেলে ভারতে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাব।

আর সেটাকে মিথ্যা প্রমাণ করে তার আগেই আমরা যখন পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে স্বাধীন দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলাম- পাকিস্তানিরাও ভেবেছে ভারতে বিলীন হয়ে যাব আমরা। সে সময় এই তিন দেশের মধ্যে পাকিস্তান ছিল সবচেয়ে ধনী আর আমরা ছিলাম হতদরিদ্র। পাকিস্তানিরা বলতো আমাদের খাওয়াতেই নাকি তাদের অর্থ শেষ হয়ে যায়। কিন্তু আজ বিশ্বের নানা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান বলছে ভারত-পাকিস্তান দুটিকে পেছেনে ফেলে আমরা ধনী রাষ্ট্র। তেজি উন্নয়নশীল ১১টি দেশের কাতারে আমরা শামিল হয়েছি।

একটি দেশ রাতারাতি গড়ে উঠতে পারে না। কম বেশি সব সরকারের কিছু না কিছু অবদান সেখানে থাকে। আমি এ প্রশ্ন তুলবো না- দেশটিকে যে আমরা আজ ৫০ বছর তিলে তিলে এগিয়ে নিয়ে আসলাম সেখানে ওলামায়ে কেরামের অবদান কতটুকু? একটি আধুনিক রাষ্ট্র গঠনে সব শ্রেণির মানুষের প্রয়োজন হয়, সব ধর্ম-মতকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যেতে হয়। সবার অবদান লাগে। সরকারি দলের লোক হলে লুটপাট, বিরোধী দলের লোক হলে না পাওয়ার যন্ত্রণায় বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা, ধর্মবাদী হলে ধর্ম গেল শোরগোল করা, বুদ্ধিজীবী হলে দুই চিমটি সরকারের, এক চিমটি বিরোধী দলের সমালোচনা করে লম্বা লম্বা বক্তৃতা দিলে- দেশ এগোয় না।

আমাদের যাবতীয় পশ্চাদপদতাকে, প্রতিহিংসাকে বিদায় দিয়ে সামনে হাঁটতে হবে। বিশ্ব এগোচ্ছে, আমরাও এগিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে যেতে চাই। কিন্তু একশ্রেণির ধর্মান্ধ মানুষের উসকানিতে আমরা কেন আবার পেছনে হাঁটবো! বিশ্বের সেরা না হই, এশিয়ার সেরা দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে আমাদের।

মাথায় রাখতে হবে আমি এই দেশের শেষ প্রজন্ম নয়- আমাদের মৃত্যুর পর আমাদের সন্তানরা এদেশে থাকবে, তার সন্তানরা থাকবে। আমরা কোন বাংলাদেশ তাদের হাতে তুলে দিয়ে যাব- তালেবানি আফগানিস্তান নাকি শান্তি-সমৃদ্ধির চীন-জাপানের প্রতিচ্ছবি বাংলাদেশ? সেটাও আমাদের নির্ধারণ করতে হবে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

মন্তব্য দিনঃ

About Ontu

Students Of Rajshahi University

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

*

x

Check Also

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ আর নেই

বিডিগার্ডিয়ান ...